HomeFifa World Cup

১৯৭৮: বিশ্বকাপ, সামরিক শাসন এবং আর্জেন্টিনার বিতর্কিত স্বপ্নপূরণ

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু আসর আছে, যেগুলো কেবল খেলার জন্য নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণেও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ তেমনই একটি অধ্যায়। এটি একদিকে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গল্প, অন্যদিকে সামরিক শাসনের ছায়া, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ম্যাচ কারচুপির অভিযোগে ঘেরা এক বিতর্কিত ইতিহাস।

১৯৭৮ সালের জুন মাসে যখন বিশ্বের চোখ আর্জেন্টিনার স্টেডিয়ামগুলোর দিকে নিবদ্ধ, তখন দেশটির বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই বছর আগে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন জর্জ রাফায়েল ভিদেলা। তার নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার “ন্যাশনাল রিঅর্গানাইজেশন প্রসেস” নামে একটি কঠোর শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল। ইতিহাসে যা পরবর্তীতে “ডার্টি ওয়ার” নামে পরিচিতি পায়। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ নিখোঁজ হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সময় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ বা নিহত হয়েছিলেন।

Argentina v Peru (1978 FIFA World Cup)

এমন এক সময়েই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ছিল আর্জেন্টিনার হাতে। সামরিক সরকার দ্রুত বুঝতে পারে, ফুটবল শুধু খেলা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারও হতে পারে। বিশ্বকাপের আলো, উল্লাস এবং জাতীয়তাবাদের আবেগের আড়ালে দেশের ভয়াবহ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আড়াল করার এক বিরল সুযোগ ছিল এটি। স্টেডিয়ামে লাখো দর্শকের উল্লাস যখন আকাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন অনেক রাজনৈতিক বন্দী নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন গোপন বন্দিশিবিরে। বুয়েনস আইরেসের কুখ্যাত ESMA বন্দিশিবির ছিল একটি স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে।

তবুও ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা ছিল শক্তিশালী একটি দল। মারিও কেম্পেস, ড্যানিয়েল পাসারেলা, ওসভালদো আরদিলেসদের নিয়ে গড়া দলটি শিরোপার অন্যতম দাবিদার ছিল। স্বাগতিক সুবিধা, উন্মাতাল সমর্থন এবং রাজনৈতিক চাপ, সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে।

কিন্তু বিশ্বকাপ যত এগোতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে বিতর্ক। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল একই গ্রুপে ছিল। ব্রাজিল তাদের ম্যাচগুলো শেষ করে প্রয়োজনীয় গোল ব্যবধান অর্জন করেছিল। ফলে আর্জেন্টিনার সামনে সমীকরণ ছিল পরিষ্কার, ফাইনালে উঠতে হলে পেরুর বিপক্ষে অন্তত চার গোলের ব্যবধানে জিততে হবে।

সেই ম্যাচেই ঘটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা।

পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনা জিতে ৬-০ গোলে। ফলটি ছিল এতটাই অপ্রত্যাশিত যে ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যে পেরু দলটি টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেছিল, তারা হঠাৎ করে এত বড় ব্যবধানে পরাজিত হলো কীভাবে?

পরবর্তী কয়েক দশকে নানা অভিযোগ, গুঞ্জন এবং গবেষণা সামনে আসে। কেউ বলেন রাজনৈতিক চাপ ছিল। কেউ দাবি করেন দুই দেশের সামরিক সরকারের মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়েছিল। আবার অভিযোগ ওঠে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পেরুকে ম্যাচ ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। এমনকি ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক ভিদেলা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের পেরুর ড্রেসিংরুমে যাওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দেয়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব অভিযোগ কখনোই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বিশ্বকাপের ফল পরিবর্তন করেনি। তাই ইতিহাসের পাতায় ম্যাচটি এখনও আর্জেন্টিনার বৈধ জয় হিসেবেই লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু সন্দেহের ছায়া কখনোই পুরোপুরি মুছে যায়নি।

ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল নেদারল্যান্ডস। চার বছর আগে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা হারানো ডাচরা আবারও ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু তাদের সামনে ছিল স্বাগতিক দলের উন্মত্ত সমর্থন, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং একটি জাতির স্বপ্ন।

ম্যাচটি ছিল নাটকীয়। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতা থাকার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে মারিও কেম্পেসের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আরও দুটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় পায়। প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় দেশটি। বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় লাখো মানুষ উদযাপনে মেতে ওঠে। সামরিক সরকার এই বিজয়কে জাতীয় ঐক্য ও নিজেদের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপটির মূল্যায়ন বদলাতে শুরু করে। ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার গবেষকরা প্রশ্ন তুলতে থাকেন, এই বিশ্বকাপ কি শুধুই ফুটবলের জয় ছিল, নাকি এটি ছিল একটি স্বৈরশাসনের প্রচারণা প্রকল্প? মাঠের ভেতরের সাফল্য কি মাঠের বাইরের অন্ধকার বাস্তবতাকে ঢেকে দিতে ব্যবহৃত হয়েছিল?

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে দাঁড়িয়ে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে দুইভাবে দেখা হয়। একদিকে এটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়, যেখানে একটি প্রতিভাবান দল দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল। অন্যদিকে এটি এমন একটি টুর্নামেন্ট, যা মনে করিয়ে দেয় খেলাধুলা কখনো কখনো রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, আর স্টেডিয়ামের উল্লাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাসের গভীরতম অন্ধকার।

সেই কারণেই ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আজও শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; এটি ক্ষমতা, প্রচারণা, জাতীয়তাবাদ এবং সত্যের জটিল সম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল। আর্জেন্টিনার হাতে সেদিন বিশ্বকাপ ট্রফি উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ট্রফির গায়ে বিতর্কের ছায়া আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

COMMENTS

WORDPRESS: 0
DISQUS: