বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় একক কোনো পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। তারা একই সঙ্গে শিল্পী, গবেষক, সংগঠক এবং চিন্তক। ওবায়দুল্লাহ মামুন তেমনই এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ও কাজ আলোকচিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে আছে।
তার পরিচয় শুধু একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে নয়—বরং তিনি একজন ভাষা আন্দোলনের গবেষক, সংগঠক, লেখক এবং প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ধারাকে বহন করে চলা এক নিবেদিত মানুষ।
১৯৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ওবায়দুল্লাহ মামুন। এই অঞ্চলের নদী, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন—সবকিছু তার শৈশবকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে তিতাস নদী, যা পরবর্তীতে তার আলোকচিত্র ও সাহিত্যকর্মে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।
গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তার দৃষ্টিভঙ্গিকে মানবিক ও সংবেদনশীল করে তোলে। এই সংবেদনশীলতাই পরবর্তীতে তার আলোকচিত্রে প্রতিফলিত হয়।
ওবায়দুল্লাহ মামুন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি বিএসএস, এমএসএস এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তার চিন্তার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে। তার শিক্ষাজীবন কেবল একাডেমিক অর্জনে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এটি তাকে ইতিহাস, সমাজ এবং সংস্কৃতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের প্রতি তার আগ্রহ এই সময়েই গড়ে ওঠে।
ফটোগ্রাফির প্রতি তার আকর্ষণ শুরু হয় তরুণ বয়সে। সেই সময় বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি একটি সংগঠিত চর্চা হিসেবে গড়ে উঠছিল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি শুধু একজন অংশগ্রহণকারী নন—বরং একজন সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Brahmanbaria Photography Society—যা বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি চর্চার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। এই সংগঠনটি স্থানীয় পর্যায়ে আলোকচিত্র চর্চাকে সংগঠিত ও প্রসারিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওবায়দুল্লাহ মামুন শুধু ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি আলোকচিত্রকে একটি আন্দোলন হিসেবে দেখেছেন এবং সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে কাজ করেছেন। তিনি Bangladesh Photographic Society-এর অর্গানাইজার সেক্রেটারি এবং নিউজলেটারের সহ-সম্পাদক (১৯৮৫–৮৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি ফটোগ্রাফির চর্চাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তিনি Bangladesh Photographic Federation-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট (১৯৮৬–৮৮) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থেকে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ফটোগ্রাফির বিকাশে কাজ করেন।
উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি পাড়ি জমান New York City-তে। সেখানে তিনি ফটোগ্রাফির বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেন, যা তার কাজকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা করে। নিউইয়র্কে তিনি একাধিক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেন। তার কাজ আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে বাংলাদেশের বাস্তবতা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনকে তুলে ধরে। প্রবাসে থেকেও তিনি নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেছেন। তার ছবিতে বাংলাদেশ বারবার ফিরে আসে—একটি স্মৃতি, একটি পরিচয় এবং একটি আবেগ হিসেবে।
ওবায়দুল্লাহ মামুনের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ২০-এরও বেশি। তিনি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তার প্রদর্শনীগুলো স্থানীয় দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। অন্যদিকে নিউইয়র্কে তার প্রদর্শনীগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে পরিচিত করে তোলে। তার প্রদর্শনীগুলো শুধু ছবি দেখার জায়গা নয়—বরং চিন্তার একটি ক্ষেত্র, যেখানে দর্শক বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
২০০৬ সালে প্রকাশিত তার একক আলোকচিত্রগ্রন্থ Titas: Chobi O Kobitay তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই বইটি প্রকাশ করে Oitijjhya। এখানে আলোকচিত্র এবং কবিতার একটি অনন্য সংলাপ তৈরি হয়েছে। তিতাস নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই কাজটি শুধু একটি ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্ট নয়—বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক দলিল। এখানে নদী, মানুষ, স্মৃতি এবং সময় একসঙ্গে মিশে গেছে।
ওবায়দুল্লাহ মামুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো—তিনি ভাষা আন্দোলনের একজন গবেষক। Language Movement নিয়ে তার গবেষণা ও প্রকাশনা তাকে একজন চিন্তাশীল লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ভাষা আন্দোলনকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেন না—বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।
ওবায়দুল্লাহ মামুনের ছবিতে একটি বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। তার ফ্রেমে নাটকীয়তা কম, কিন্তু গভীরতা বেশি। তিনি বাস্তবতাকে সরাসরি তুলে ধরেন, কিন্তু তার ভেতরে একটি কাব্যিকতা থাকে। এই কাব্যিকতা তার ছবিকে আলাদা মাত্রা দেয়। তার কাজের মধ্যে নদী, মানুষ, গ্রামীণ জীবন এবং সাংস্কৃতিক চিহ্ন বারবার ফিরে আসে।
বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি আন্দোলনে ওবায়দুল্লাহ মামুনের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে সময় কাজ শুরু করেন, সেই সময় ফটোগ্রাফি একটি সংগঠিত রূপ নিচ্ছিল। তার উদ্যোগ, সংগঠনিক কাজ এবং সৃজনশীল অবদান এই ধারাকে শক্তিশালী করেছে। আজকের তরুণ ফটোগ্র্রাফারদের জন্য তার জীবন একটি অনুপ্রেরণা—বিশেষ করে যারা আলোকচিত্রকে শুধুমাত্র পেশা নয়, বরং একটি চিন্তার মাধ্যম হিসেবে দেখতে চায়।
ওবায়দুল্লাহ মামুন এমন একজন মানুষ, যিনি ক্যামেরার মাধ্যমে সময়কে ধরেছেন, আর লেখার মাধ্যমে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফটোগ্রাফি শুধু একটি ছবি নয়, বরং একটি দলিল; একটি স্মৃতি; একটি চেতনা।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের জীবন—সবকিছুই তার কাজের ভেতরে একসূত্রে গাঁথা।
এই কারণেই তিনি শুধু একজন ফটোগ্রাফার নন—তিনি একজন নীরব ইতিহাসকার, যিনি আলো দিয়ে গল্প বলেন, আর সেই গল্প সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে।




