বাংলাদেশের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী ও সিনেমাটোগ্রাফার মাকসুদুল বারী, যিনি ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্র—উভয় মাধ্যমেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, দীর্ঘ কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে নিজেকে বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
১৯৪৯ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী বারী একাধারে আলোকচিত্রী, চিত্রগ্রাহক, স্থিরচিত্রগ্রাহক, শিক্ষক এবং সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। দেশে খুব কম শিল্পীই আছেন, যারা একইসঙ্গে ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফিতে দক্ষতা ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এই সীমিত তালিকায় তার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি ১৯৭৫ সালে ফটোগ্রাফি শুরু করেন এবং একই বছর বেগার্ট থেকে প্রশিক্ষণ নেন। ওই সময়েই বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যুক্ত হন এবং সংগঠনটির নামকরণের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি বিপিএস-এর আজীবন সদস্য হন।
১৯৭০ ও ১৯৮০–এর দশকে তিনি একজন সক্রিয় ও প্রভাবশালী আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জাপানে ইউনেস্কো আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন তার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
চলচ্চিত্রে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রায় পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রায় ৫০টি তথ্যচিত্র এবং ৩৫০টিরও বেশি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। ২০০৩ সালে ‘আধিয়ার’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি পান। এর আগে ‘পরিণীতা’ চলচ্চিত্রের জন্য বাচসাস পুরস্কারে সেরা সাদাকালো চিত্রগ্রাহক হিসেবে সম্মানিত হন।
বারী আরও কাজ করেছেন ‘রানীকুঠির বাকি ইতিহাস’ চলচ্চিত্রে এবং তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের কিছু অংশে চিত্রগ্রাহক হিসেবে। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মানজারে হাসিনের সঙ্গে তার একাধিক কাজ রয়েছে, যার মধ্যে ‘বিল ডাকাতিয়ার বৃত্তান্ত’ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘আগামী’–এর চিত্রগ্রাহক হিসেবেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নিমকো এবং বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের “আলোর ইশকুল” কর্মসূচির মাধ্যমেও তিনি তরুণদের ফটোগ্রাফি শিক্ষা দিয়েছেন।
১৯৭৬ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে তিনি ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে সিনেমাটোগ্রাফি ও ফটোগ্রাফিতে চার বছরব্যাপী ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে, মাকসুদুল বারী জনসম্মুখে কম দেখা গেলেও তার দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





