মার্চের সেই দিনগুলোতে বাংলার আকাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। বাতাসে ছিল আতঙ্কের চাপা গুঞ্জন, মানুষের চোখে জমে উঠেছিল প্রশ্ন আর আশঙ্কা। রাত নামলেই শহর আর গ্রাম কেঁপে উঠত বুটের শব্দে। অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে আসত কান্না, আর রক্তের গন্ধে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যেত।
ঠিক সেই সময়, চট্টগ্রামের এক কোণে, একজন মানুষ নিজের ভেতরের ভয়কে স্তব্ধ করে শুনছিলেন ইতিহাসের ডাক। তিনি জানতেন—নীরবতা মানে পরাজয়। তাঁর নাম মেজর জিয়াউর রহমান।
২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতের পর আর কোনো দ্বিধা রইল না। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের অধীনে থাকা এক বাঙালি অফিসার সিদ্ধান্ত নিলেন—এই অস্ত্র আর অন্যায়ের পক্ষে থাকবে না। তিনি বুঝেছিলেন, এই মুহূর্তে সত্য উচ্চারণ করা মানেই নিজের জীবন বাজি রাখা।
২৬ মার্চ। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র। চারপাশে অনিশ্চয়তার ঘন ছায়া। যেকোনো মুহূর্তে থেমে যেতে পারে সবকিছু। তবু সেই নীরবতার বুক চিরে উঠে এল একটি কণ্ঠ—দৃঢ়, স্পষ্ট, নির্ভীক।
তিনি বললেন, বাংলাদেশ স্বাধীন।
সে কণ্ঠ শুধু বেতারের তরঙ্গে আটকে থাকেনি। তা ছড়িয়ে পড়েছিল নদীর পারে, ধানক্ষেতে, পাহাড়ের গায়ে। ভাঙা মনোবলে জন্ম নিল সাহস। আতঙ্কের জায়গা নিল প্রত্যয়। মানুষ বুঝে গেল—এই দেশ এখন আর নতজানু থাকবে না।
এরপর শুরু হলো রক্ত ও ধৈর্যের পথচলা। জিয়াউর রহমান যুদ্ধকে দেখেছিলেন শৃঙ্খলার চোখে, সাহসের হৃদয়ে। তিনি নিলেন সেক্টরের দায়িত্ব, গড়লেন জেড ফোর্স—যেখানে অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল বিশ্বাস, আর প্রশিক্ষণের চেয়ে শক্ত ছিল লক্ষ্য। সীমান্তের দুর্গম পথে, নদীর অচেনা স্রোতে, পাহাড়ের নিঃশব্দতায় তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠল প্রতিরোধের দেয়াল।
তিনি সামনে দাঁড়াতেন—নির্দেশ দিয়ে নয়, উপস্থিতি দিয়ে। তাঁর চোখে ছিল স্থিরতা, কণ্ঠে ছিল আশ্বাস। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ক্লান্ত, তিনি তখন আশ্রয় হয়ে দাঁড়াতেন; যখন ভয়, তখন সাহস। যুদ্ধ তাঁর কাছে শুধু শত্রুকে পরাজিত করার নাম ছিল না—এ ছিল আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই।
নয় মাসের দীর্ঘ পথে, ক্ষুধা আর ক্লান্তি যখন মানুষের শরীর ভেঙে দিত, তখনও ভাঙেনি তাঁর সংকল্প। ধীরে ধীরে অন্ধকার পাতলা হলো। ইতিহাসের পাতায় লেখা হতে লাগল বিজয়ের পূর্বাভাস।
ডিসেম্বর এল। আকাশে উড়ল স্বাধীনতার পতাকা। সেই পতাকার রঙে মিশে রইল অগণিত আত্মত্যাগ, আর নীরবে লেখা হলো এক বীরের নাম—জিয়াউর রহমান।





