১৯৭১ সালের মার্চ। বাতাসে বারুদের গন্ধ, শহর জুড়ে আতঙ্ক। ঢাকার রাজপথে ট্যাংকের শব্দ, আর মানুষের চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন— আমরা কি বাঁচব?
সেই সময় চট্টগ্রামে এক বাঙালি সেনা অফিসার নিঃশব্দে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তাঁর নাম মেজর জিয়াউর রহমান।
তিনি জানতেন, এই মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকা মানে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পোশাক তাঁর শরীরে থাকলেও, হৃদয়ে ছিল বাংলা মায়ের ডাক। ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর যখন চট্টগ্রামে পৌঁছায়, তখন আর কোনো দ্বিধা রইল না—এই যুদ্ধ এড়ানো যাবে না।
২৬ মার্চের অন্ধকার রাত। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র। চারদিকে উৎকণ্ঠা, যে কোনো মুহূর্তে শত্রু আক্রমণ আসতে পারে। সেই অনিশ্চিত পরিবেশে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন জিয়াউর রহমান। কণ্ঠে কোনো কাঁপুনি নেই, চোখে ভয় নেই। তিনি জানতেন, এই কয়েকটি বাক্য হয়তো তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবু দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন—
“আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”
এই ঘোষণা শুধু বেতারের তরঙ্গে ভাসেনি—তা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রাম থেকে গ্রামে, অস্ত্রহীন মানুষের বুকের ভেতর। ভাঙা মনোবল শক্ত হয়ে উঠল, জন্ম নিল মুক্তিযোদ্ধা।
এরপর শুরু হলো যুদ্ধের কঠিন দিন। জিয়াউর রহমান নিলেন সেক্টর–১-এর দায়িত্ব, পরে গঠন করলেন জেড ফোর্স—বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড। সীমিত অস্ত্র, অল্প প্রশিক্ষণ, কিন্তু অগাধ সাহস। পাহাড়, নদী আর সীমান্তবর্তী দুর্গম অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চলতে লাগল।
তিনি শুধু কমান্ড পোস্টে বসে নির্দেশ দেননি। গোলাগুলির শব্দের মধ্যেই তাঁকে দেখা যেত সামনে দাঁড়িয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে চোখ রেখে বলতেন—
“ভয় পেলে চলবে না। এই মাটি আমাদের।”
কখনো রাতের অন্ধকারে নদী পার হয়ে আক্রমণ, কখনো পাহাড়ি পথে দীর্ঘ পদযাত্রা। খাবার নেই, বিশ্রাম নেই—তবু মনোবল অটুট। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শিখে গেল শৃঙ্খলা, কৌশল আর আত্মত্যাগের মানে।
পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারল—এই যুদ্ধ আর সহজ নয়। প্রতিটি আঘাত তাদের শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে একটি প্রতিরোধ থেকে রূপ নিচ্ছে নিশ্চিত বিজয়ের পথে।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষে আসে বিজয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ে যায় আকাশে। সেই পতাকার প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে জিয়াউর রহমানের মতো সাহসী যোদ্ধাদের গল্প।





